তাজিয়া মিছিলে হামলা: ‍বিচারে দুই বছর গেল আসামির বয়স বিতর্কে

    জাহিদ হাসান ওরফে রানা এবং মাসুদ রানা ওরফে সুমন নামের ওই দুই আসামির বয়স বিতর্কের অবসান ঘটলেও করোনাভাইরাস মহামারীতে ফের আটকে যায় বিচার প্রক্রিয়া। ফলশ্রুতিতে ২০১৮ সালের ২২ অক্টোবরের পর এই মামলায় আর সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি।
    ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান এ মামলার বিচার করছেন। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ৪৬ সাক্ষীর মধ্যে ১১তম সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়ার পর আর অগ্রগতি হয়নি।
    মামলার বিষয়ে ওই আদালতের বেঞ্চ সহকারী রুহুল আমিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুই আসামির বয়স নির্ধারণে জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন এই মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। আদালতের নির্দেশে জটিলতা নিরসন হয়েছে। এই মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য আছে।”
    ২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর প্রথম প্রহরে তাজিয়া মিছিলের জন্য পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে হোসাইনী দালান ইমামবাড়ায় সমবেত হয়েছিলেন ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ। পরপর তিনটি বোমা বিস্ফোরণে অর্ধশত আহত হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাজ্জাদ হোসেন নামের এক কিশোর ও জামাল উদ্দিন নামে একজন মারা যান।
    হামলার দুদিন পর অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে চকবাজার থানায় মামলা করে পুলিশ। মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. শফিউদ্দিন শেখ।
    পরের বছর ১৮ অক্টেবর নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) ১০ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এর মধ্যেই ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ; অভিযানের সময় কথিত বন্দুকযুদ্ধে সন্দেহভাজন তিন জঙ্গি নিহত হয়।
    ২০১৭ সালের ৩১ মে ঢাকার মহানগর জজ আদালতে গ্রেপ্তার ১০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ২০১৮ বছরের ১৪ মে মামলাটি ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়। এই আদালতে সর্বশেষ সাক্ষ্য দেন ওই দিন বোমা হামলায় নিহত একজনের সহোদর আবু সাইদ (৪৯)।
    এরইমধ্যে ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে কারাবন্দি আসামি জাহিদ হাসান ওরফে রানার বয়স ১৮ বছর হয়নি জানিয়ে মামলাটি শিশু আদালতে পাঠানোর আবেদন করেন তার আইনজীবী ফারুক আহাম্মাদ।
    গ্রেপ্তারের সময় ওই আসামি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন জানিয়ে তার জন্ম নিবন্ধন ও জেএসসি পরীক্ষার প্রাবেশপত্র আদালতে দাখিল করেন তিনি।
    অবেদনে বলা হয়, ওই আসামির জন্ম ১৯৯৮ সালের ৭ অগাস্ট। ফলে শিশু আইন অনুযায়ী তার বিচার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইবুনালে হতে পারে না।
    বিচারক ওই আবেদনের শুনানি করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদশক মো. শফিউদ্দিন শেখকে ওই কিশোরের বিরুদ্ধে শিশু আইনের ১৩ ধারা অনুযায়ী আলাদা অভিযোগপত্র দাখিল করতে বলেন।
    সে অনুযায়ী তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকার শিশু আদালতে (দুই নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল) আলাদা অভিযোগপত্র জমা দেন।
    এরপর আরেক আসামি মাসুদ রানার আইনজীবীও তাকে অপ্রাপ্ত ঘোষণা করে শিশু আদালতে বিচারের আবেদন করেন। তার বিরুদ্ধেও আলাদা অভিযোগপত্র দাখিলের পর তার বিচার শিশু আদালতে স্থানান্তরের আদেশ হয়েছে বলে জানান আদালতের বেঞ্চ সহকারী রুহুল আমিন।
    দুই আসামির বয়স জটিলতা নিরসন হওয়ায় এখন মামলার সাক্ষ্যগ্রহণে গতি আসবে বলে আশা করছেন এই আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর গোলাম ছারোয়ার খান জাকির।
    তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইতোমধ্যে কয়েকজন সাক্ষীর ‘টেন্ডারের’ আবেদন করা হয়েছে। তারা আগের সাক্ষীদের বক্তব্য সমর্থন করায় তাদের জবানবন্দি গ্রহণের আর প্রয়োজন পড়বে না। সার্বিক বিবেচনায় মামলাটির বিচার প্রক্রিয়া দ্রুতই শেষ হওয়ার ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।”
    তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ মামলার তদন্ত নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
    তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কেমন তদন্ত হল যে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ার পর আসামির বয়স নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রকৃতপক্ষে এই আসামিরা ঘটনার সঙ্গে কতটা সম্পৃক্ত সেটাই প্রশ্নবিদ্ধ। এখানে দায়সারা তদন্ত হয়েছে। আমরা আশা করছি, আসামিরা ন্যায়বিচার পাবেন।”
    মামলার নথিপত্রে দেখা যায়, সাক্ষীরা প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে মামলার ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। কিন্তু কেউ আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো কিছু বলেননি।
    এই কারণে আসামিদের আইনজীবী ফারুক আহাম্মাদ তাদের জেরাও করতে চাননি। বাদী আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যেও কোনো আসামিকে শনাক্ত করেননি বলে জানান আইনজীবী ফারুক।
    পরে মামলার ১০ আসামির মধ্যে চারজন জামিন পেয়েছেন। এরা হলেন- নেত্রকোণার কলমাকান্দার লেংগুড়া মধ্যপাড়ার ওমর ফারুক মানিক, একই উপজেলার হাফেজ আহসান উল্লাহ মাসুদ, গাজীপুরের কালিয়াকৈরের বড়ইতলী গ্রামের শাহজালাল মিয়া এবং গাইবন্ধার সাঘাটার ডিমলা পদুম শহরের চান মিয়া।
    কারাগারে আছেন- সাঘাটার কচুয়া দক্ষিণপাড়ার কবির হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আশিক, বগুড়ার আদমদীঘির কেশরতা গ্রামের মাসুদ রানা মাসুদ ওরফে সুমন, দিনাজপুর কোতোয়ালির ঘাসিপাড়ার আবু সাঈদ রাসেল ওরফে সোলায়মান ওরফে সালমান ওরফে সায়মন, দিনাজপুরের রুবেল ইসলাম ওরফে সজীব ওরফে সুমন, রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের পশ্চিম ইব্রাহিমনগর বালুরমাঠ এলাকার আরমান ওরফে মনির এবং কামরাঙ্গীরচরের পূর্ব রসুলপুরের জাহিদ হাসান ওরফে রানা ওরফে মুসায়াব।
    এদের মধ্যে জাহিদ, আরমান, রুবেল ও কবির আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
    মামলার নথিতে বলা হয়, ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত আবদুল্লাহ বাকি ওরফে নোমান ছিলেন হোসাইনী দালানে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী। হামলার আগে ১০ অক্টোবর তারা বৈঠক করে হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন।
    বোমা হামলার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন জাহিদ, আরমান ও কবির। কবির ও জাহিদ ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করেন। হামলার পর আশ্রয়ের জন্য কামরাঙ্গীরচরে বাসা ভাড়া করেন আরমান ও রুবেল। ঘটনাস্থলে আরমান পরপর পাঁচটি বোমা ছুঁড়েন।
    বাকি পাঁচজন চান মিয়া, ওমর ফারুক, আহসানউল্লাহ, শাহজালাল ও আবু সাঈদ হামলার চিত্র ভিডিও করা ছাড়াও হামলায় উদ্বুদ্ধ ও সহায়তা করেন। আসামি মাসুদ রানারও হামলায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আগের দিন গাবতলীতে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে এএসআই ইব্রাহীম মোল্লাকে হত্যার সময় ঘটনাস্থলে গ্রেপ্তার হন তিনি।